আজ ৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২১শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মহাবিপদ হয়ে আসছে ‘ ঘূর্ণিঝড় মোকা’

জাহিদুর রহমান: বাড়ছে গতি, সঙ্গে শক্তি। বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোকা’। দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট এ ঝড় ধীরে এলেও রূপ নিয়েছে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে। সামান্য বাঁক বদলে ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটার গতির বাতাস বুকে নিয়ে বাংলাদেশ উপকূলের ৭৯৫ কিলোমিটারের মধ্যে ফণা তুলছে। এরই প্রভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে সাগর। কক্সবাজারে ঝরেছে মুষলধারে বৃষ্টি। বাতাসের বেগ দেখে আবহাওয়া অধিদপ্তর কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৮ নম্বর মহাবিপদ এবং মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলেছে। কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ড এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ মে’র পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।

এদিকে, মোকা নিয়ে রেড অ্যালার্ট জারি করেছে দুর্যোগ সতর্কতাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ডিজাস্টার অ্যালার্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন সিস্টেম (জিডিএসিএস)। সংস্থাটি এ মুহূর্তে বিশ্বে চলমান দুর্যোগগুলোর মধ্যে মোকাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করেছে।

গতকাল রাত সাড়ে ১০টা থেকে সব ধরনের লঞ্চ ও নৌযান সদরঘাট থেকে চলাচল বন্ধ রয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। মহেশখালীর নিকটবর্তী সাগরে ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ সাময়িক বন্ধ রাখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়। এতে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা অঞ্চলে আজ শনিবার গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রও আংশিক বা পুরো বন্ধ থাকতে পারে। কক্সবাজার সৈকতের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাস।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মোকার প্রভাবে আজ শনিবার সন্ধ্যা থেকেই কক্সবাজারসহ দেশের অন্যত্র ঝরবে বৃষ্টি। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতের সময় হতে পারে জলোচ্ছ্বাস। আগামীকাল রোববার সন্ধ্যা নাগাদ অতিক্রম করতে পারে কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূল। ঘূর্ণিঝড় এগিয়ে আসায় উপকূলে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। বিশেষ করে দুর্গম চর, টেকনাফের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয়কেন্দ্র হাতের নাগালে থাকলেও সম্পদের মায়া তাড়া করে ফিরছে তাঁদের। ঝড়ের বেগে ঝরে যেতে পারে মৌসুমি ফল, জলোচ্ছ্বাসে নুয়ে পড়তে পারে ধানক্ষেত। তবে এসব ঝুঁকি মাথায় রেখেই উপকূলে চলছে জোর প্রস্তুতি। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতি দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে। টেকনাফের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সেন্টমার্টিন থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বাসিন্দাদের। সেখানে ৩৬টি ভবন ও স্থাপনাকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করেছে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন। দ্বীপে ৭ দিনের খাদ্য মজুতের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশের অন্য উপকূলেও চলছে প্রচার। প্রস্তুত করা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।

উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিকের গতিপথ বদলে সামান্য বাঁক নিয়ে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছে ঘূর্ণিবায়ুর চক্র। এভাবে এগোলে আগামী রোববার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ মোকা বাংলাদেশের কক্সবাজার এবং মিয়ানমারের কিয়াউকপিউয়ের মধ্যবর্তী এলাকা অতিক্রম করতে পারে বলে আভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ঘূর্ণিঝড় মোকা চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৩০ কিলোমিটার, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৬০, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৯০ এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। সে সময় ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রের কাছে বাতাসের একটানা গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার, যা দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া আকারে ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছিল। শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে ঝড়টি ঘণ্টায় ১১ কিলোমিটার গতিতে এগিয়েছে। বর্তমান অবস্থান থেকে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসরের মাধ্যমে মোকা আরও ঘনীভূত হতে পারে। উপকূলে আসার সময় প্রচুর বৃষ্টি ঝরাবে ঘূর্ণিঝড়টি। সঙ্গে উপকূলীয় নিচু এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে ২ থেকে ২.৭ মিটার বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত করতে পারে। ৮ নম্বর মহা-বিপৎসংকেতের আওতায় থাকবে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা ও এর অদূরবর্তী দ্বীপ এবং চরগুলো।

ভারতের আবহাওয়া অফিসের বুলেটিনে বলা হয়েছে, উপকূলে আঘাতের সময় মোকার বাতাসের শক্তি থাকতে পারে ঘণ্টায় ১৫০ থেকে ১৬০ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়া আকারে ১৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। যদিও টাইফুন ওয়ার্নিং সেন্টার বলছে, আঘাতের সময় ২০০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যেতে পারে মোকার ঘূর্ণিবাতাসের শক্তি।

বাতাসের গতিবেগ ৬২ থেকে ৮৮ কিলোমিটার হলে সেটি সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়। ৮৮ থেকে ১১৭ পর্যন্ত প্রবল ঘূর্ণিঝড়, ১১৭ থেকে ২২০ কিলোমিটার বেগে বইলে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং বাতাসের গতি ২২০ কিলোমিটার পার হলে তাকে সুপারসাইক্লোন বলা হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ শামিম হাসান ভূঁইয়া বলেন, ‘মোকা সবচেয়ে প্রভাব ফেলতে পারে কক্সবাজার উপকূল ও সেন্টমার্টিন দ্বীপে। দ্বীপের বড় অংশ জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়তে পারে। ঝড়ের সময় ছাড়াও আগে-পরের বৃষ্টিতে আশঙ্কা রয়েছে ভূমিধসের।’

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘যেসব মডেল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তাতে টেকনাফের দক্ষিণ দিক দিয়ে ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র চলে যাবে বলে মনে হচ্ছে। এটি আমাদের সীমানার বাইরে। তবে কেন্দ্র পরিবর্তনও হতে পারে। এবার ঘূর্ণিঝড়ের শরীরের ৫০ শতাংশ চলে যাচ্ছে মিয়ানমারে; বাকিটা থাকছে বাংলাদেশে। এ ক্ষেত্রে আমরা পাচ্ছি ঘূর্ণিঝড়ের বাঁ দিক, যেটির তীব্রতা ডান দিকের চেয়ে সাধারণত কম। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্র যেখান দিয়ে যায়, সেখানে ক্ষতি বেশি হয়। এর পর থাকে ডান দিক, পরে বাঁ।’ তিনি বলেন, ‘মোকার কেন্দ্র টেকনাফ দিয়ে গেলে সেখানে তীব্রতা বেশি হবে। ক্ষতির দিক থেকে টেকনাফকে ২০ নম্বর দেওয়া হলে, এর পরই আকিয়াব বা মিয়ানমার উপকূলকে দিতে হবে ১৯। টেকনাফের ওপরে কক্সবাজারকে দিতে হবে ১৮ নম্বর।’

পরিচালক জানান, ঘূর্ণিঝড়টির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তের পরিধির বিস্তার ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে অতিভারী বৃষ্টি, প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রবৃষ্টি ও জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। প্রবল বৃষ্টির ফলে ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে।

কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। মোকা দ্বীপটি অতিক্রমের সময় বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ থেকে ১৮০ কিলোমিটারের বেশি থাকতে পারে। এতে দ্বীপে ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস হতে পারে। সেন্টমার্টিন অতিক্রমে ঘূর্ণিঝড়টির ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা লাগতে পারে। এ সময় সেখানে উচ্চ জলোচ্ছ্বাস থাকতে পারে।’

কক্সবাজারের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী জনগণকে আজ সকাল থেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থলে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান।

ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির পরিচালক আহমাদুল হক জানান, সারাদেশে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে। এখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের অন্তত দু’বেলার খাবার দিতে প্রয়োজনীয় অর্থ ও শুকনো খাবার পাঠানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় প্রতিটি ক্যাম্পে ১০০ জন করে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ উপকূলীয় সব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, আনসার, কোস্টগার্ড প্রস্তুত রয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে মেডিকেল টিম গঠন, খাবার স্যালাইন, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, প্রয়োজনীয় ওষুধ, সাপে কাটা রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম, অ্যাম্বুলেন্স, ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স ও প্রয়োজনীয় জ্বালানি প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’

ন্যাশনাল ওশানোগ্রাফিক অ্যান্ড মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের (নোয়ামি) নির্বাহী পরিচালক ড. মোহন কুমার দাশ বলেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় হয়েছিল ১৯৯১ সালের ৩০ এপ্রিল। এর পর কক্সবাজার উপকূলে ১৯৯২ সালের ২২ অক্টোবর, ১৯৯৪ সালের ৩ মে, ১৯৯৫ সালের ২৫ নভেম্বর এবং ১৯৯৬ সালের ৮ মে ঘূর্ণিঝড় আঘাত করেছে। ২০১৭ সালের ৩০ মে ঘূর্ণিঝড় মোরা চট্টগ্রাম উপকূল দিয়ে অতিক্রম করলে এর প্রভাবে কক্সবাজারে ব্যাপক ক্ষতি হয়।

২০১৫ সালে রয়্যাল মিটিওরোলোজিক্যাল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত ইদ্রিস আলম তাঁর গবেষণা প্রবন্ধে ১৪৮৪ সাল থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলে সরাসরি আঘাত হেনেছে এমন ১৮৭টি ঘূর্ণিঝড়ের ক্যাটালগ বিশ্লেষণ করেছেন। এর মধ্যে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল ও খুলনা উপকূল দিয়ে যথাক্রমে ৩০, ৪৬, ১৯, ৪১ এবং ৫১টি ঘূর্ণিঝড় অতিক্রম করেছে।

সৌজন্যে- দৈনিক সমকাল।

     এই ক্যাটাগরির অন্যান্য নিউজ

Jaxx Wallet Download

Jaxx Liberty Wallet

Atomic Wallet

Atomic Wallet Download

gem visa login

gem visa australia